বেনাপোল বন্দরে ভারত-মিয়ানমারের ইলিশের ঢল, ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে ১,৪০০–১,৮০০ টাকায়
- আপডেট সময় : ০১:৩২:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৫২১ বার পড়া হয়েছে
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় ইলিশ আমদানি হচ্ছে। আমদানিকারকদের দাবি, এসব মাছ বৈধভাবে এলসির মাধ্যমে আনা হলেও বাজারে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিদেশি ইলিশকে দেশি বা ‘পদ্মার ইলিশ’ পরিচয়ে চড়া দামে বিক্রি করছেন।
এতে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
কাস্টমস ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ এসেছে। এসব মাছের ঘোষিত আমদানি মূল্য মোট প্রায় ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, দুই মাসে ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিস ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল ও রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ মোট ২২ জন আমদানিকারক এসব ইলিশ আমদানি করেছেন।
আমদানিকারকদের হিসাব অনুযায়ী, এলসির মাধ্যমে আমদানি করা ইলিশের মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ২৫২ টাকা। এর সঙ্গে সরকারি শুল্ক প্রায় ১৬২ টাকা এবং ট্রাক ভাড়া, এলসি খরচসহ অন্যান্য ব্যয় যোগ হলে প্রতি কেজিতে মোট খরচ পড়ে প্রায় ৫১৪ টাকা। তবে বাজারে এসব মাছ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে বাজারে দেশি ইলিশের দাম তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ কেজি ২০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ বর্তমানে প্রতি কেজি প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
দেশি ইলিশের নামে বিদেশি মাছ বিক্রির অভিযোগ
ক্রেতাদের অভিযোগ, দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে ভারতীয় বা মিয়ানমারের ইলিশের সঙ্গে দেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা কঠিন। ফলে অনেক ব্যবসায়ী বিদেশি ইলিশকে চাঁদপুর, বরিশাল বা চট্টগ্রামের ইলিশ বলে বিক্রি করছেন।
বেনাপোল বাজারে মাছ কিনতে আসা মো. মহিউদ্দিন বলেন, দেশি ইলিশ মনে করে তিনি একটি মাছ কিনেছিলেন। পরে রান্না করে খাওয়ার পর স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য বুঝতে পারেন। তার ভাষ্য, দেখতে একই রকম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের সহজেই বিভ্রান্ত করা সম্ভব।
আরেক ক্রেতা আনোয়ারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বিদেশি ইলিশকে বিভিন্ন এলাকার দেশি ইলিশের পরিচয়ে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে। তিনি প্রশাসনের নজরদারি ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তার বক্তব্য
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য রয়েছে। মোট ২২ জন আমদানিকারক এসব মাছ এনেছেন। মাছ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।
তিনি জানান, বেনাপোল দিয়ে আমদানি হওয়া মাছ ভারতীয় ইলিশ। মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশ সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। তবে দেশের বিভিন্ন বাজারে মিয়ানমারের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। এসব মাছকে অনেকে ‘রোহিঙ্গা ইলিশ’ নামেও অভিহিত করেন।
সাদা মাছের ঘোষণায় ইলিশ জব্দ
এদিকে একটি সূত্রের দাবি, বৈধ আমদানির পাশাপাশি অবৈধভাবেও কিছু ইলিশ দেশে প্রবেশ করেছে। গত ২২ জুলাই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা ১২ কার্টন, প্রায় ৩৬০ কেজি ভারতীয় ইলিশ জব্দ করে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
দেশি ইলিশ ব্যবসায়ীদের ক্ষতির আশঙ্কা
বেনাপোল বাজারের দেশি ইলিশ ব্যবসায়ী উৎস্য মন্ডল, বাবু, মাহাবুব, মোস্তাফিজুর ও পরিতোষ বিশ্বাসসহ কয়েকজন জানান, কম দামে বড় আকারের বিদেশি ইলিশ বাজারে আসায় দেশি ইলিশের বিক্রি কমে গেছে। ক্রেতারা দামের পার্থক্যের কারণে বিদেশি মাছের দিকে ঝুঁকছেন।
তাদের অভিযোগ, বিদেশি ইলিশকে দেশি ইলিশের নামে বিক্রি করা হলে একদিকে ক্রেতারা প্রতারিত হন, অন্যদিকে প্রকৃত দেশি ইলিশ ব্যবসায়ীরাও বাজার হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
নাভারন বাজারের মাছ ব্যবসায়ী যাদব হালদার বলেন, ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা এসব ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। বৈধভাবে এলসির মাধ্যমে আমদানি করা মাছও রয়েছে। তবে বিদেশি ইলিশের ব্যাপক সরবরাহে দেশি ইলিশের বাজারে প্রভাব পড়ছে।
আমদানিকারকদের দাবি, তারা বৈধভাবেই মাছ আনছেন
যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আমদানিকারক বলেন, তারা এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে বৈধভাবে ইলিশ আমদানি করছেন এবং সরকারি শুল্ক পরিশোধ করছেন। আমদানির পর মাছ আড়তদারদের কাছে বিক্রি করা হয়। আড়তদার বা বাজারের ব্যবসায়ীরা কী পরিচয়ে মাছ বিক্রি করছেন, সেটি তাদের বিষয় বলে দাবি করেন তারা।
এদিকে ক্রেতাদের দাবি, বিদেশি ইলিশ দেশি ইলিশের নামে বিক্রি ঠেকাতে বাজারে নিয়মিত অভিযান চালানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাছের উৎস, আমদানির কাগজপত্র এবং বিক্রির সময় মাছের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।




















