দেবিদ্বারে বাংলাদেশি নাগরিকদের রোহিঙ্গা বলে প্রচারের অভিযোগ, ফতেহাবাদের জন্মসনদ বিতর্কে নতুন মোড়
- আপডেট সময় : ০১:৪৭:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৬০৯ বার পড়া হয়েছে
ফতেহাবাদের জন্মসনদ বিতর্কে নতুন মোড়, বাংলাদেশি নাগরিকদের রোহিঙ্গা বলে প্রচারের অভিযোগ
ফতেহাবাদের জন্মসনদ বিতর্কে নতুন মোড়
দেবিদ্বারে বাংলাদেশি নাগরিকদের রোহিঙ্গা বলে প্রচারের অভিযোগ
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রোহিঙ্গা নাগরিককে জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগকে ঘিরে চলমান বিতর্কে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জন্মনিবন্ধন নিয়ে তদন্তের আওতায় আসা তিন ব্যক্তি—মুবিনা খাতুন, হাফিছা ও সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ—রোহিঙ্গা নন; তারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার জনপ্রতিনিধিরা।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ওই তিনজনকে রোহিঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করে সংবাদ প্রকাশিত হলেও, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করে এর ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুবিনা খাতুনের জন্মনিবন্ধন সনদে তার স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজারের টেকনাফ সদর উল্লেখ রয়েছে। তার জন্মনিবন্ধন নম্বর ১৯৭৮১৯১৪০৪৭১৩০১০১। তার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, মা নুরজাহান বেগম কক্সবাজার সদর উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা।
মুবিনা খাতুনের মা নুরজাহান বেগম বলেন, তার সাবেক স্বামী আবুল কাশেম অনেক বছর আগে মারা গেছেন। তার মেয়ে মুবিনাও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তারা মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা নন দাবি করে নুরজাহান বলেন, মুবিনার জন্ম কক্সবাজার সদরে এবং তার বাবা-ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশের নাগরিক।
অন্যদিকে, হাফিছার জন্মনিবন্ধন সনদে তার স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড উল্লেখ রয়েছে। তার জন্মনিবন্ধন নম্বর ২০০৫১৯১৪০৪৭১৩০১২। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন এবং সেখানেই বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
ভারুয়াখালী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুরুল আমিন কাজল বলেন, হাফিছা, আবু হেনা সিদ্দিকী ইশমাম ও জুনাইরা আফরিন আঁখি তার প্রতিবেশী এবং তারা ওই ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা।
তিনি আরও বলেন, চেয়ারম্যান না থাকায় এলাকায় সাধারণ নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য এলাকা থেকে নাগরিক সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে সমস্যার সমাধান করছেন।
তৃতীয় ব্যক্তি সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদের জন্মনিবন্ধন সনদে তার স্থায়ী ঠিকানা কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার পোয়ানক ইউনিয়নের রছুয়ারগুনা গ্রাম উল্লেখ রয়েছে। তার জন্মনিবন্ধন নম্বর ১৯৯৮১৯১৪০৪৭১৩০১০৫। বর্তমানে তিনি আবুধাবিতে প্রবাসে রয়েছেন।
সাইমুনের বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, জরুরি প্রয়োজনে ডিজিটাল জন্মসনদের প্রয়োজন হওয়ায় পরিচিত একজনের মাধ্যমে তার ছেলের জন্মসনদ তৈরি করা হয়। তাদের পরিবার মিয়ানমারের নাগরিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, তাদের পূর্বপুরুষরা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক।
ফতেহাবাদে অন্য এলাকার বাসিন্দাদের জন্মনিবন্ধন
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মুবিনা খাতুন, হাফিছা ও সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ ছাড়াও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন ব্যক্তি ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন নিয়েছেন। তাদের মধ্যে আবু হেনা সিদ্দিকী ইশমাম, জুনাইরা আফরিন আঁখি, নূর মামিন ও মাজেদের নামও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নিজেদের এলাকায় জন্মনিবন্ধন থাকার পরও বয়স সংশোধন, নাম সংশোধনসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় কেউ কেউ দালালের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে নতুন করে জন্মনিবন্ধন করার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে তাদের ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাবেক কর্মকর্তার বক্তব্য ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ডিজিটাল সেন্টারের সাবেক উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান রাজিব তাকে জিম্মি করে জোরপূর্বক বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিতেন।
তার দাবি, তিনি ছুটিতে থাকা অবস্থায় রাজিব নাগরিকদের সমস্যার কথা বলে বিভিন্ন সময় তার কাছ থেকে ওটিপি নেন এবং ওই ওটিপি ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের জন্মসনদ দেন। বিষয়টি পরে তিনি জানতে পারেন বলে জানান।
নজরুল ইসলাম বলেন, তিনি এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত চান এবং তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ইউজার এক্সেস পাওয়ার আগেই জন্মনিবন্ধন তৈরির দাবি
ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড তিনি পান ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচিত জন্মনিবন্ধনগুলো তৈরি হয়েছে ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি। অর্থাৎ তিনি ইউজার এক্সেস পাওয়ার আগেই এসব জন্মনিবন্ধন তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কারা, কীভাবে এবং কোন আইডি ব্যবহার করে এসব জন্মনিবন্ধন তৈরি করেছে, তা তার জানা নেই।
তদন্ত চলছে: জেলা প্রশাসক
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার বলেন, ইস্যু করা জন্মনিবন্ধন সনদ কোনো রোহিঙ্গাকে দেওয়া হয়েছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে কেউ অপরাধী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্মনিবন্ধন ইস্যুর প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, কারা এসব সনদ তৈরি করেছেন এবং কোন ইউজার আইডি ব্যবহার করা হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।



















