যশোরের শার্শায় ৩৫ বিঘার মাছের ঘের নিয়ে বিরোধ, প্রাণভয়ে বাড়িছাড়া ব্যবসায়ী
- আপডেট সময় : ০৩:১০:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৫১০ বার পড়া হয়েছে
যশোরের শার্শা উপজেলার স্বরূপদাহ গ্রামে ৩৫ বিঘা জমির মাছের ঘেরের দখল ও ৬০ লাখ টাকা দাবিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। ঘেরের মালিকানা ও দখল নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঘেরের মালিক তবিবুর রহমানের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হুমায়ুন কবির ওরফে ঝনু তার কাছে ৬০ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় তাকে প্রাণনাশ ও মামলার ভয় দেখানো হচ্ছে। এ কারণে তিনি বাড়িতে থাকতে পারছেন না। পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্যদের ঘেরে মাছ ধরতে গেলে বাধা, মারধর ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবিবুর রহমান বলেন, একসময় ঝনুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন ব্যবসায় তারা অংশীদারও ছিলেন। একপর্যায়ে ব্যবসার হিসাব নিয়ে আলোচনার পর ঝনু তার কাছে ৬০ লাখ টাকা দাবি করেন। তবে তার হিসাবে ঝনুর কাছে বরং প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে দাবি করেন তবিবুর।
তিনি আরও বলেন, “টাকা না দিলে সমস্যা হবে—এমন কথা বলা হয়েছে। এরপর থেকেই জীবন ও মামলার ভয়ে আমি বাইরে থাকছি। এই সুযোগে আমার ৩৫ বিঘা জমির মাছের ঘেরও দখলে নেওয়া হয়েছে।”
তবিবুরের বাবা ইউসুফ আলীর অভিযোগ, তাদের নিজেদের ঘেরে জাল ফেলতে গেলেও বাধা দেওয়া হয়। জাল নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঘের থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
তবিবুরের মা সহিতা বেগম বলেন, “আমার ছেলেকে বাড়িতে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের জমি ও মাছের ঘের হয়েও আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। আমরা এর বিচার চাই।”
সরেজমিনে যা দেখা গেল
স্বরূপদাহের মাঠে গিয়ে ঘেরটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখা যায়। ঘেরপাড়ে কোনো পাহারাদার বা দৃশ্যমান স্থাপনা চোখে পড়েনি। মাঠে থাকা কয়েকজন চাষি জানান, ঘেরটি তবিবুর রহমানের পরিবারের—এমনটাই তারা জানেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তবিবুরকে ঘেরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলেও তারা দাবি করেন।
স্থানীয় চাষি ফজলুর রহমান বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্য স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সমাধান না হলে বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল, সফিকুল ও হাফিজুরসহ কয়েকজনের ভাষ্য, আগে তবিবুরকে ঘেরে যেতে কোনো বাধা দেওয়া হতো না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার ঝনুর
তবে তবিবুর রহমানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হুমায়ুন কবির ওরফে ঝনু। তিনি বলেন, ৬০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়নি। বরং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে একটি অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল এবং ওই মামলায় তার যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেই খরচ তবিবুরের কাছে দাবি করেছেন।
ঝনুর দাবি, নাভারণ গরুর হাটের সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে ঢাকার মুগদা থানার একটি অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। এ ঘটনায় তবিবুরের ভূমিকা ছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। পরে জামিনে বের হয়ে তিনি ঝিকরগাছা এলাকায় বসবাস করেছেন বলে জানান।
ঘের দখলের অভিযোগও অস্বীকার করে ঝনু বলেন, তিনি ঘের দখল করে রাখেননি এবং সেখান থেকে কোনো মাছও ধরেননি। বর্ষার পানিতে প্রাকৃতিকভাবে মাছ ঢুকলে স্থানীয় কেউ তা ধরে থাকতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ঘেরপাড়ে তবিবুরের উত্তোলন করা বালি যাতে অন্য কেউ নিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য তিনি ঘেরটি পাহারা দিয়েছেন।
বিরোধের সমাধান প্রসঙ্গে ঝনু বলেন, বিষয়টি নিয়ে যশোর জেলা ও শার্শা উপজেলা পর্যায়ের বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। নেতারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা তিনি মেনে নেবেন। মামলার খরচ হিসেবে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে নেবেন, আবার মাফ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তার আপত্তি নেই বলে জানান।
তবে তবিবুর রহমান বলেন, তিনি নিজেও ওই অস্ত্র মামলার আসামি ছিলেন। তার প্রশ্ন, তিনি কীভাবে ঝনুকে ডিবি দিয়ে আটক করাবেন। তাদের দুজনের একই মামলায় সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তবিবুর রহমান তার বাড়ি ও ৩৫ বিঘা মাছের ঘেরের শান্তিপূর্ণ দখল ফিরে পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে তার বৈধ সম্পত্তি দখল করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা চান তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, দুই পক্ষের অভিযোগ তদন্ত করে ঘেরের প্রকৃত মালিকানা ও বর্তমান দখল পরিস্থিতি যাচাই করা হোক। পাশাপাশি হুমকি, মারধর কিংবা জোরপূর্বক দখলের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামিমুল হক বলেন, “এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”





















