কলকাতায় হোটেল বন্ধ, ভাড়া দ্বিগুণ—বিপাকে বাংলাদেশি রোগী-পর্যটক
- আপডেট সময় : ০২:৫৫:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৫১৭ বার পড়া হয়েছে
কলকাতায় হোটেল বন্ধ, ভাড়া দ্বিগুণ—বিপাকে বাংলাদেশি রোগী-পর্যটক
হোটেল বন্ধ, ভাড়া দ্বিগুণ—কলকাতায় বিপাকে বাংলাদেশি রোগী-পর্যটক
ভারতের কলকাতায় আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যুর পর শুরু হওয়া নিরাপত্তা অভিযানে একের পর এক হোটেল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে কলকাতায় যাওয়া রোগীরা।
আগে থেকে হোটেল বুকিং করেও অনেকেই কলকাতায় গিয়ে নির্ধারিত আবাসনে উঠতে পারছেন না। কেউ নতুন হোটেল খুঁজে হয়রান হচ্ছেন, কেউ গুনছেন বাড়তি ভাড়া। আবার কেউ চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা গেছে, ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ভারত-বাংলাদেশে যাতায়াত করেছেন ২২ হাজার ৯৫ জন পাসপোর্টযাত্রী। তাদের মধ্যে বাংলাদেশি ১০ হাজার ৮৭৫ জন, ভারতীয় ৩ হাজার ৯৫১ জন এবং অন্যান্য দেশের ২৫ জন নাগরিক ছিলেন।
অগ্নিকাণ্ডের পর শুরু অভিযান
গত ১৯ আগস্ট রাতে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশিসহ নয়জনের মৃত্যু হয়। এরপর কলকাতা প্রশাসন আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালাগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই শুরু করে।
নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে একের পর এক অভিযান চালানো হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০টি হোটেল রয়েছে।
এ পর্যন্ত ৯১৯টি হোটেল ও অতিথিশালায় অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪১টিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো সন্তোষজনক পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনে ঘাটতি থাকায় অধিকাংশ হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এক হোটেল থেকে আরেক হোটেলে ছুটছেন বাংলাদেশিরা
হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কলকাতায় অবস্থানরত বাংলাদেশিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকে এক হোটেল থেকে অন্য হোটেলে ঘুরেও থাকার জায়গা পাচ্ছেন না। কোথাও জায়গা মিললেও আগের তুলনায় দেড় থেকে দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হচ্ছে।
কলকাতায় জায়গা না পেয়ে অনেক বাংলাদেশি শিয়ালদহ, মুকুন্দপুর, আনন্দপুর, বারাসাত, দমদম ও জাকারিয়া স্ট্রিটের মতো দূরের এলাকায় থাকার ব্যবস্থা করছেন।
ফেরত আসা কয়েকজন যাত্রী জানান, যেসব হোটেলের দৈনিক ভাড়া আগে প্রায় এক হাজার রুপি ছিল, সেগুলোর কোনো কোনোটি এখন দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার রুপি পর্যন্ত দাবি করছে। ৫০০ থেকে ৬০০ রুপির হোটেলেও এখন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ রুপি পর্যন্ত ভাড়া চাওয়া হচ্ছে।
চিকিৎসা করাতে এসে বাড়তি খরচের চাপ
কলকাতায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসার পাশাপাশি আবাসন খরচ কম রাখার চেষ্টা করেন অনেক রোগী ও তাদের স্বজন। কিন্তু হোটেল সংকট ও বাড়তি ভাড়ায় তাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
অনেকেই চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরছেন। আবার কেউ হাসপাতালের আশপাশে থাকার জায়গা না পেয়ে দূরবর্তী এলাকায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশি রোগীদের জন্য কিছু হাসপাতাল নির্দিষ্ট হোটেলের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বললেও সেখানেও পর্যাপ্ত আসন পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিরাপদ হোটেল বুকিং নিয়েও সংকট
সম্প্রতি কলকাতার বাংলাদেশ উপহাইকমিশন চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে কলকাতাগামী বাংলাদেশিদের আগেভাগে নিরাপদ হোটেল বুক করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক হোটেলই এখন অগ্রিম বুকিং নিচ্ছে না।
ফলে ভিসা থাকা সত্ত্বেও থাকার জায়গা নিশ্চিত করতে না পেরে অনেক বাংলাদেশি ভারত সফর স্থগিত করতে বাধ্য হচ্ছেন।
‘চিকিৎসা রেখেই দেশে ফিরেছি’
ভারতফেরত পাসপোর্টযাত্রী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চিকিৎসার জন্য ২০ আগস্ট ভারতে গিয়েছিলেন। কলকাতার বড়বাজার এলাকার একটি হোটেলে ছিলেন। শিখা ইন হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ অভিযান শুরু করলে যে হোটেলে ছিলেন সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, আরও এক সপ্তাহ কলকাতায় থাকার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু হোটেল সংকট, বাড়তি ভাড়া ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে চিকিৎসা শেষ না করেই দেশে ফিরতে হয়েছে।
বরিশালের শ্যামল কুমার রায় স্ত্রীকে চিকিৎসা করাতে কলকাতা যাচ্ছেন। তিনি বলেন, হোটেল বন্ধের খবর শুনে কিছুটা আতঙ্কেই যেতে হচ্ছে। কলকাতায় আত্মীয় থাকলেও তাদের বাসা ছোট হওয়ায় হোটেলেই থাকতে হয়। সেখানে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে কি না, সেটিই এখন বড় চিন্তা।
পর্যটন ব্যবসায়ও বড় ধাক্কার আশঙ্কা
কলকাতার হোটেল ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীদের ঘিরে নিউ মার্কেটসহ আশপাশের এলাকায় আবাসিক হোটেল, খাবারের দোকান, পরিবহন, কেনাকাটা ও নানা ধরনের ব্যবসা গড়ে উঠেছে।
একটি আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার প্রভাত সরকার বলেন, করোনার পর থেকেই নানা কারণে ব্যবসায় মন্দা চলছে। পর্যটক ভিসা চালু হওয়ায় বাংলাদেশি যাত্রী বাড়তে শুরু করেছিল। এর মধ্যেই হোটেল বন্ধের ঘটনা ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ধাক্কা।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পর্যটকদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি না মানা হোটেলের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক দিনের হিসাব অনুযায়ী আগের তুলনায় ভারতে গিয়ে দেশে ফেরার যাত্রী কিছুটা বেশি। তবে এর নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে তার কাছে তথ্য নেই। দুই দেশের মধ্যে যাত্রী চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

















