ভাতা প্রাপ্তির জটিলতা দূর করার পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
হিজড়া জনগোষ্ঠীর ভাতা বিষয়ক সামাজিক নিরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে গণশুনানি
- আপডেট সময় : ০৬:০১:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৫২৭ বার পড়া হয়েছে
ভাতা, শিক্ষা-কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
হিজড়া জনগোষ্ঠীর সরকারি ভাতা প্রাপ্তির বাস্তব চিত্র, সরকারি সেবা গ্রহণে বিদ্যমান সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা এবং সেবার কার্যকারিতা নিয়ে সামাজিক নিরীক্ষার প্রতিবেদনভিত্তিক গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে লাইটহাউজের উদ্যোগে আয়োজিত এ গণশুনানিতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, সমাজসেবা বিভাগের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন।
সামাজিক নিরীক্ষার অংশ হিসেবে বাড্ডা, রামপুরা ও মগবাজার এলাকার প্রায় ৬৫ জন হিজড়া প্রতিনিধির কাছ থেকে প্রশ্নমালার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি তেজগাঁও ও খিলগাঁও এলাকার হিজড়া ভাতা সংক্রান্ত তথ্যও সংগ্রহ করা হয়।
সেবাগ্রহীতা হিজড়া জনগোষ্ঠী ও সেবাদাতা সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে সামাজিক নিরীক্ষার প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। পরে ওই প্রতিবেদনের ফলাফল নিয়ে সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতাদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময় এবং গণশুনানির আয়োজন করা হয়।
গণশুনানিতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সরকারি ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারাও এসব বিষয়ে মতামত দেন এবং সমস্যা সমাধানে করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়, তেজগাঁও, ঢাকার উপপরিচালক আবু সাঈদ মোঃ কাওসার রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন দাবি ও সমস্যার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলেন, সরকারি সেবা, বিশেষ করে ভাতা সংক্রান্ত সমস্যা সহজীকরণ ও সমাধানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। সেবাগ্রহীতাদের সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। প্রয়োজন ও সমস্যার বিষয়ে সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে বিদ্যমান সুযোগের আওতায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আবু সাঈদ মোঃ কাওসার রহমান বলেন, সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার মধ্যে সরাসরি মতবিনিময় এবং সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সেবার সহজপ্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
তিনি আরও জানান, ঢাকার ৩৯টি সরকারি হাসপাতালের সমাজসেবা কার্যালয় ও সমাজসেবা জোনের সঙ্গে সমন্বয় ও যোগাযোগ জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীর কোনো সদস্য স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার না হন এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা পেতে সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কার্যালয়ের সহযোগিতা নিতে পারেন—এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রধান অতিথি বলেন, হিজড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে শুধু ভাতা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ এবং আত্মনির্ভরশীলতার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি ভাতা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, কেউ বাদ পড়ছেন কি না এবং সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোথায় প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—এসব বিষয় চিহ্নিত করা সম্ভব। স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
গণশুনানিতে বক্তারা বলেন, সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের নিয়ে নিয়মিত সামাজিক নিরীক্ষা ও গণশুনানি করা হলে স্থানীয় সমস্যাগুলো সরাসরি চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
বিশেষ করে ভাতা প্রাপ্তির জটিলতা, জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত সমস্যা, সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য গণশৌচাগার এবং স্যানিটেশন সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। জনবহুল এলাকায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন বক্তারা।
এ ছাড়া শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা এবং সরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
গণশুনানিতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সামাজিক কাঠামো ও নেতৃত্বব্যবস্থা নিয়েও মতামত উঠে আসে। সরকারি সেবা ও অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোঃ জিয়াউর রহমান, সহকারী পরিচালক তাসলিমা খাতুন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মোঃ ফিরোজ হোসেনসহ হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।
গণশুনানিতে সামাজিক নিরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সরকারি ভাতা ও অন্যান্য সামাজিক সেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।


























