গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিকদের ৫% বিলম্বজনিত পাওনা নিষ্পত্তিতে এনবিআরের কার্যকর উদ্যোগ দাবি
- আপডেট সময় : ০৮:৪৪:১০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৫৩৩ বার পড়া হয়েছে
বিটিআরসির ADR-সংক্রান্ত পরামর্শের আলোকে লিখিত মতামত ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের আহ্বান
ঢাকা, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, মঙ্গলবার: গ্রামীণফোনের ২০১০–২০১২ সময়কালের শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল (WPPF) ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল (WWF)-সংক্রান্ত ৫% বিলম্বজনিত পাওনা নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যকর উদ্যোগের দাবিতে আজ রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনের সামনে তৃতীয়বারের মতো শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ।

কর্মসূচি থেকে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর ধরে অমীমাংসিত এই পাওনার বিষয়ে এনবিআরের সুস্পষ্ট অবস্থান, পূর্বে দাখিলকৃত স্মারকলিপির অগ্রগতি সম্পর্কে লিখিত জবাব, সম্ভাব্য সরকারি রাজস্বের যথাযথ হিসাব যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান।
তৃতীয়বারের মতো রাজস্ব ভবনের সামনে অবস্থান
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। পরবর্তী সময়ে ৮ সেপ্টেম্বর রাজস্ব ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে একই বিষয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। সর্বশেষ আজ ১৩ অক্টোবর আবারও রাজস্ব ভবনের সামনে উপস্থিত হয়ে সংগঠনটি তাদের দাবি তুলে ধরেছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, একাধিকবার আবেদন ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনের পরও বিষয়টির অগ্রগতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট লিখিত তথ্য না পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। দীর্ঘদিনের এই অমীমাংসিত বিষয়টির নিষ্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ও সময়োপযোগী উদ্যোগ এখন অত্যন্ত জরুরি।
বিটিআরসির পক্ষে ADR-এর মাধ্যমে সমাধানের প্রসঙ্গ
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি বিশেষভাবে উল্লেখ করে যে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এ-সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক পত্র জারি করেছে। ওই পত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution—ADR) পদ্ধতির মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণের প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে। পত্রে বিটিআরসির আইন শাখার পর্যালোচনার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিটিআরসির এ-সংক্রান্ত পদক্ষেপ আলোচনাভিত্তিক ও আইনসম্মত সমাধানের পথ অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের নিজ নিজ এখতিয়ার অনুযায়ী দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন।

তাঁরা বলেন, এনবিআরের কাছে আমাদের দাবি, বিটিআরসির পত্র পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট পাওনার রাজস্ব ও আর্থিক দায়-দায়িত্বের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট লিখিত মতামত প্রদান করা হোক এবং প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর আলোকে আইনানুগ নিষ্পত্তির দাবি
সংগঠনের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য, গ্রামীণফোনের সংশ্লিষ্ট সময়কালের WPPF ও WWF-সংক্রান্ত পাওনা এবং বিলম্বজনিত আর্থিক দায়ের বিষয়টি বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর প্রাসঙ্গিক বিধান ও অন্যান্য প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তাঁরা বলেন, সংশ্লিষ্ট তহবিলের অর্থ নির্ধারিত সময়ে জমা বা পরিশোধ না করার কারণে কোনো অতিরিক্ত আর্থিক দায়, সুদ বা ক্ষতিপূরণ প্রযোজ্য হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি ও পরিমাণ যথাযথ নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
ঐক্য পরিষদ মনে করে, শ্রমিকদের আইনগত পাওনা নিষ্পত্তির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায় ও সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তির পথ আরও সুগম হবে।
সম্ভাব্য ১৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব যাচাইয়ের আহ্বান
ঐক্য পরিষদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পাওনা ও আর্থিক দায় নিষ্পত্তির মাধ্যমে সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। সংগঠনটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তবে সংগঠনটি স্পষ্ট করেছে, এটি তাদের প্রাথমিক হিসাব; প্রকৃত রাজস্বের পরিমাণ ও আদায়যোগ্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আইনানুগ যাচাই, প্রমাণ্য নথি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভরশীল।
এনবিআরের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, বিষয়টির আর্থিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট হিসাব ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে সরকারের সম্ভাব্য প্রাপ্য রাজস্বের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
এনবিআরের প্রতি ছয় দফা দাবি
কর্মসূচি থেকে ঐক্য পরিষদ নিম্নলিখিত দাবিগুলো তুলে ধরে—
১. পূর্ববর্তী স্মারকলিপির অগ্রগতি: ৩ আগস্ট ও ৮ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
২. বিটিআরসির পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে মতামত: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের বিটিআরসির পত্র পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এনবিআরের রাজস্ব ও আর্থিক দায়-দায়িত্বসংক্রান্ত লিখিত মতামত দিতে হবে।
৩. আইনানুগ যাচাই: বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধিবিধানের আলোকে ২০১০–২০১২ সময়কালের সংশ্লিষ্ট পাওনা ও বিলম্বজনিত আর্থিক দায় পর্যালোচনা করতে হবে।
৪. সম্ভাব্য রাজস্ব নির্ধারণ: সংগঠনের উত্থাপিত সম্ভাব্য সরকারি রাজস্বের হিসাব যথাযথভাবে যাচাই করে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও সমন্বয়: এনবিআরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিটিআরসি, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।
৬. ADR-এর মাধ্যমে সমাধান: গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা অন্য কোনো আইনসম্মত পদ্ধতিতে বিষয়টির গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
‘আমরা অনুদান চাই না, চাই আইনগত পাওনার ন্যায্য নিষ্পত্তি’
ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অমীমাংসিত থাকায় হাজারো শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
তাঁরা বলেন, “আমরা কোনো অনুদান, বিশেষ সুবিধা কিংবা কারও অনুকম্পা চাই না। আমরা চাই, প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী আমাদের দাবিগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক এবং আইনগতভাবে প্রাপ্য পাওনার ন্যায্য নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে সরকারের প্রাপ্য রাজস্বের বিষয়টিও যথাযথভাবে যাচাই করা হোক।”
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, তাঁদের লক্ষ্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করা নয়; বরং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ও আইনসম্মত সমাধানে পৌঁছানো। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের লিখিত মতামত, দায়িত্বশীল উদ্যোগ এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা
ঐক্য পরিষদ আশা প্রকাশ করে যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিষয়টির দীর্ঘসূত্রতা ও আর্থিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, পূর্ববর্তী আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে লিখিতভাবে অবহিত করবে এবং প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের ব্যবস্থা করবে।
সংগঠনটি জানায়, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও সম্মানজনক সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তারা ইতিবাচকভাবে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে সংশ্লিষ্ট দাবির কার্যকর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাদের শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।



























