১৬ বছরের ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায়ের দাবিতে গ্রামীণ টেলিকম ভবনের সামনে শ্রমিকদের মানববন্ধন ও বিক্ষোভ
- আপডেট সময় : ০৯:১২:০২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৫২১ বার পড়া হয়েছে
স্মারকলিপি গ্রহণ না করার অভিযোগ, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কার্যকর ভূমিকার দাবি
গ্রামীণফোন লিমিটেডের সাবেক ও বর্তমান শ্রমিকদের ২০১০–২০১২ সময়কালের শ্রমিকদের অংশগ্রহণ তহবিল (WPPF) ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল (WWF)-সংক্রান্ত ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত আইনগত পাওনা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে গ্রামীণ টেলিকম ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে ‘গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচি থেকে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অনিষ্পন্ন থাকা শ্রমিকদের পাওনা দ্রুত নিষ্পত্তি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জোরালো ও কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
১৬ বছর ধরে পাওনা নিষ্পত্তির অপেক্ষা
ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ জানান, গ্রামীণফোনের সাবেক ও বর্তমান শ্রমিকদের ২০১০–২০১২ সময়কালের ৫ শতাংশ বিলম্বজনিত বকেয়া পাওনা দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন রয়েছে। এ পাওনা আদায়ের দাবিতে ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে সাবেক গ্রামীণফোন কর্মীরা ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত আন্দোলন পরিচালনা করে আসছেন।
সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার ৩০০ সাবেক ও বর্তমান শ্রমিক এবং তাঁদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই পাওনা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।
৩০ সেপ্টেম্বর স্মারকলিপি গ্রহণ না করার অভিযোগ
ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে একই স্থানে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষে গ্রামীণ টেলিকম কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেনি বলে তাঁদের অভিযোগ।
নেতৃবৃন্দ বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে শ্রমিকদের আইনগত পাওনা অনিষ্পন্ন থাকা অবস্থায় তাঁদের বক্তব্য ও দাবিসংবলিত স্মারকলিপি গ্রহণ না করা অত্যন্ত দুঃখজনক। একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে শ্রমিকদের কথা শোনা, আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি এবং ন্যায্য সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ প্রত্যাশিত।
গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদ ও গ্রামীণ টেলিকমের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন গ্রামীণফোনের অন্যতম প্রধান শেয়ারহোল্ডার গ্রামীণ টেলিকমের ৩৪ দশমিক ২০ শতাংশ শেয়ার মালিকানা রয়েছে বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদে গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে শ্রমিকদের পাওনা অনিষ্পন্ন থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা এ বিষয়ে কী কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন? শ্রমিকদের ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া নিষ্পত্তির বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কি না এবং সমাধানের লক্ষ্যে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তাঁরা বলেন, গ্রামীণ টেলিকমের উল্লেখযোগ্য শেয়ার মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সমঝোতার উদ্যোগে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। তবে শেয়ার মালিকানা একাই কোনো বিরোধে আইনগত দায় নির্ধারণ করে না বলেও সংগঠনটি উল্লেখ করে।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নৈতিক দায়িত্ব ও কার্যকর ভূমিকার দাবি ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বব্যাপী সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির একজন সুপরিচিত প্রবক্তা। গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টতা এবং গ্রামীণ পরিবারের সামাজিক ও মানবিক দর্শনের প্রেক্ষাপটে সাবেক গ্রামীণফোন শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন পাওনা নিষ্পত্তিতে তাঁর আরও জোরালো, দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা থাকা উচিত বলে মনে করে সংগঠনটি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের আদর্শ শুধু বক্তব্য ও দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি। হাজারো শ্রমিক পরিবারের ন্যায্য পাওনা দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকার বিষয়টি সেই মূল্যবোধের আলোকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পাঁচটি প্রশ্ন
ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়।
১. গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিকদের ২০১০–২০১২ সময়কালের ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে অনিষ্পন্ন থাকার বিষয়ে তাঁর অবস্থান কী?
২. গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টতার প্রেক্ষাপটে এ বিরোধের ন্যায্য নিষ্পত্তিতে তিনি কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন অথবা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কী পরামর্শ দিয়েছেন?
৩. গ্রামীণফোন ও গ্রামীণ টেলিকমের সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের পাওনা নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি কি আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেন না?
৪. গত ৩০ সেপ্টেম্বর শ্রমিকদের স্মারকলিপি গ্রহণ না করার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য কী? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী হতে পারে?
৫. দীর্ঘদিনের এ বিরোধ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) পদ্ধতিতে সমাধানের লক্ষ্যে তিনি কি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে সক্রিয় সহযোগিতা করবেন?
নেতৃবৃন্দ বলেন, “আমরা মনে করি, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত একজন ব্যক্তিত্বের নৈতিক নেতৃত্ব ও কার্যকর সহযোগিতা এই দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর কাছে আমাদের বিনীত প্রত্যাশা, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে দৃশ্যমান ও গঠনমূলক উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
ঐক্য পরিষদ আশা প্রকাশ করে, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর সামাজিক ও মানবিক অঙ্গীকারের আলোকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ, সমঝোতা এবং দ্রুত আইনসম্মত নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।
ঐক্য পরিষদের সাত দফা দাবি
গ্রামীণফোন, গ্রামীণ টেলিকম ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ঐক্য পরিষদের প্রধান দাবিগুলো হলো—
১. বকেয়া নিষ্পত্তি: ২০১০–২০১২ সময়কালের ৫ শতাংশ WPPF/WWF বিলম্ব বকেয়া দ্রুত ও আইনসম্মতভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।
২. স্মারকলিপির বিষয়ে ব্যাখ্যা: গত ৩০ সেপ্টেম্বর স্মারকলিপি গ্রহণ না করার অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. পরিচালনা পর্ষদের আলোচ্যসূচি: গ্রামীণফোনের পরিচালনা পর্ষদে শ্রমিকদের পাওনা নিষ্পত্তির বিষয়টি আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. গৃহীত পদক্ষেপ প্রকাশ: গ্রামীণ টেলিকম-সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের এ বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থান প্রকাশ করতে হবে।
৫. নৈতিক নেতৃত্ব ও সহযোগিতা: অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নৈতিক নেতৃত্ব ও সক্রিয় সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপের উদ্যোগ নিতে হবে।
৬. ADR-এর মাধ্যমে সমাধান: গ্রামীণফোন, গ্রামীণ টেলিকম, টেলিনর ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) পদ্ধতিতে দ্রুত, স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সম্মানজনক সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
৭. অগ্রগতি জানানো: শ্রমিকদের পাওনা নিষ্পত্তির অগ্রগতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা
ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ জানান, ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকরা ধারাবাহিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং একাধিক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের পরও দীর্ঘদিনের এ বিরোধের কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি বলে তাঁদের দাবি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, “আমরা কোনো অনুদান বা অনুগ্রহ চাই না। আমরা চাই আমাদের আইনগত পাওনার ন্যায্য নিষ্পত্তি। ১৬ বছরের অপেক্ষা যথেষ্ট। এখন আর আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
তাঁরা গ্রামীণফোন, গ্রামীণ টেলিকম, টেলিনর, সংশ্লিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনকে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আলোচনায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে দাবি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও আইনসম্মত আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তাঁরা।
ঐক্য পরিষদের আহ্বান
ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়, “১৬ বছরের অপেক্ষা যথেষ্ট। আর সময়ক্ষেপণ নয়। স্মারকলিপি গ্রহণ করুন, সংলাপ শুরু করুন, পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করুন। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নৈতিক নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের কার্যকর উদ্যোগে ADR-এর মাধ্যমে ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি চাই।”



























